খাতাকলম ছাড়াই হিসাব, বিশ্বাসের ওপর টিকে ধনুকর শরিফুলের ব্যবসা
নগদবিহীন লেনদেনের যুগ যখন দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে, দিনাজপুরের ঘুঘুডাঙ্গা এলাকায় তার বিপরীত এক চমকপ্রদ দৃষ্টান্ত গড়ে তুলেছেন ধনুকর শরিফুল ইসলাম (৫০)। কেবল আস্থার ওপর ভরসা করে তিনি গ্রামে গ্রামে ঘুরে বাকিতে লেপ-তোশক তৈরি করে দেন, আর শীত বিদায়ের সময় গ্রাহকরাও স্বেচ্ছায় পাওনা পরিশোধ করে যান। চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার সন্তান এই কারিগর দীর্ঘদিন ধরে দিনাজপুর সদর উপজেলার ৬ নম্বর আউলিয়াপুর ইউনিয়নের ঘুঘুডাঙ্গা এলাকায় এই পেশায় নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন।
জানা যায়, ভাদ্র মাস শেষ হওয়ার আগেই মালামাল ও সঙ্গীদের নিয়ে ঘুঘুডাঙ্গায় পৌঁছে যান শরিফুল ইসলাম। একটি মৌসুমে তিনি প্রায় ২৫০ থেকে ৩০০টি লেপ-তোশক বাকির ভিত্তিতে তৈরি করেন। বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, এতগুলো লেনদেনের হিসাব তিনি রাখেন পুরোপুরি মুখস্থ। কোনো খাতা-কলম ছাড়াই এক নজরে বলে দিতে পারেন কোন গ্রাহকের কাছে কত টাকা পাওনা রয়েছে।
পাঁচ থেকে ছয় বছর ধরে তিনি এভাবে ধার-বাকিতে লেপ, তোশক ও বালিশ বানিয়ে দিচ্ছেন জানিয়ে শরিফুল ইসলাম বলেন, ‘খাতা-কলম কিছুই লাগে না, মুখ দেখলেই বলে দিতে পারি কার কাছে কত টাকা পাওনা আছে। তাছাড়া গ্রামের মানুষ আমাকে কোনোদিন ঠকায়নি। আমার প্রতি তাদের আস্থা আছে। বাকি চাইলে না করবে না। আমার বিশ্বাস আছে গ্রামের মানুষ যাদের আমি উপকার করছি, তারা আমাকে ঠকাবে না।’
সেবার বিনিময়ে তিনি কোনো সুদ-সুযোগও নেন না। এলাকার এক নারী লেপের মাপ জানিয়ে তুলা, কাপড় ও মজুরিসহ খরচের হিসাব চাইলে তিনি জানান, লাগবে দুই হাজার ৩০০ টাকা। নগদ ও বাকির দামে কোনো তফাত না রাখার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি পরিশ্রম করে অর্থ উপার্জন করি। সুদ খাই না। নগদ নেন আর বাকিতে নেন, আপনার সঙ্গে যা দাম হবে তাই দিতে হবে।’
ঘুঘুডাঙ্গা বাজারে তার একটি দোকান রয়েছে, যেখানে থাকা-খাওয়াসহ কাজের সামগ্রীও রাখেন তিনি। পৌষ মাসের শেষে শীত বিদায় নিলে গ্রামে গ্রামে ঘুরে ফেরার তারিখ জানিয়ে যান, আর গ্রামবাসীও সেই তারিখেই তাকে বকেয়া টাকা দিয়ে বিদায় জানান। আস্থা ও পারস্পরিক সুসম্পর্কের এই বন্ধন প্রমাণ করছে, প্রযুক্তির যুগেও মানুষের ওপর মানুষের বিশ্বাস অটুট থাকতে পারে।

