অশান্ত বিশ্বের বুকে লাল-সবুজের শান্তিরক্ষীরাঃকাজী জীম
যুদ্ধ, সহিংসতা ও রাজনৈতিক অস্থিরতায় জর্জরিত বর্তমান বিশ্বে শান্তি আজ এক বিরল প্রত্যাশা। বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে গৃহযুদ্ধ, সন্ত্রাসবাদ, জাতিগত সংঘাত এবং ক্ষমতার দ্বন্দ্ব মানুষের স্বাভাবিক জীবনকে প্রতিনিয়ত বিপন্ন করে তুলছে। এমন এক বাস্তবতায় অশান্ত বিশ্বের বুকে শান্তির আলো জ্বালিয়ে রাখছেন বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীরা।
মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত মরুভূমি, আফ্রিকার দুর্গম অরণ্য, পাহাড়বেষ্টিত বিপজ্জনক অঞ্চল কিংবা সমুদ্রঘেঁষা অচেনা উপকূলে—নিজ দেশের মাটি থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে দাঁড়িয়ে তারা নিষ্ঠা ও সাহসের সঙ্গে পালন করছেন জাতিসংঘ প্রদত্ত দায়িত্ব। শারীরিকভাবে তারা বিদেশের মাটিতে অবস্থান করলেও তাদের মন-প্রাণ জুড়ে থাকে লাল-সবুজের বাংলাদেশ, যেখানে অপেক্ষায় থাকে পরিবার, প্রিয়জন, মা–বাবা ও সন্তানের মুখ।
শান্তিরক্ষা মিশনে দায়িত্ব পালন মানেই প্রতিনিয়ত ঝুঁকির মুখোমুখি হওয়া। কখন কোথায় সন্ত্রাসী হামলা, ল্যান্ডমাইন বিস্ফোরণ কিংবা ড্রোন আক্রমণ ঘটবে—তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। প্রতিটি দিন শুরু হয় অজানা আশঙ্কা নিয়ে এবং শেষ হয় নিরাপদে বেঁচে ফেরার প্রার্থনায়। তবুও বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার দৃঢ় অঙ্গীকার, মানবতার প্রতি দায়বদ্ধতা এবং দেশের সম্মান রক্ষার শপথই বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের এগিয়ে যেতে শক্তি ও সাহস জোগায়। এই আত্মত্যাগ, নিষ্ঠা ও দায়িত্ববোধই তাদের বিশ্ববাসীর কাছে আলাদা মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করেছে।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী এবং বাংলাদেশ পুলিশের কর্মকর্তা ও সদস্যরা দীর্ঘদিন ধরেই জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে পেশাদারিত্ব, সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। যুদ্ধবিরতি পর্যবেক্ষণ, অস্ত্র সমর্পণ তদারকি, সংঘাতপূর্ণ এলাকায় টহল, শরণার্থী সুরক্ষা এবং বেসামরিক নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব তারা দক্ষতার সঙ্গে সম্পন্ন করছেন। একই সঙ্গে স্থানীয় প্রশাসন ও আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন।
বাংলাদেশের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমের সূচনা ঘটে ১৯৮৮ সালে। সে বছর United Nations Iran–Iraq Military Observer Group (UNIIMOG)-এ ১৫ জন সামরিক পর্যবেক্ষক প্রেরণের মাধ্যমে বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে অংশগ্রহণ করে। এই পদক্ষেপ বাংলাদেশের জন্য এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে এবং আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে দেশের সক্ষমতার স্বাক্ষর রাখে।
পরবর্তীতে ১৯৮৯ সালে United Nations Transition Assistance Group (UNTAG)-এর অধীনে নামিবিয়ায় শান্তিরক্ষা মিশনে অংশগ্রহণ ছিল বাংলাদেশের প্রথম পূর্ণাঙ্গ শান্তিরক্ষা কার্যক্রম। নামিবিয়ার স্বাধীনতা প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ, শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তর এবং অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করার মাধ্যমে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের ভাবমূর্তি সুদৃঢ় করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
এরপর থেকে ধারাবাহিকভাবে বাংলাদেশের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পেতে থাকে। এ পর্যন্ত বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী ও পুলিশের প্রায় এক থেকে এক দশমিক আট লাখ সদস্য বিশ্বের ৪০টিরও বেশি দেশে ৬০টির অধিক জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে দায়িত্ব পালন করেছেন। আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশে পরিচালিত এসব মিশনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হয়েছে।
এসব মিশনের আওতায় যুদ্ধবিরতি পর্যবেক্ষণ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, বেসামরিক নাগরিক সুরক্ষা, চিকিৎসা ও শিক্ষা সহায়তা, মানবিক ত্রাণ বিতরণ, অবকাঠামো নির্মাণ এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চল পুনর্গঠনের মতো বহুমাত্রিক কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে।
সংঘাতকবলিত অঞ্চলে সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জনে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। অনেক ক্ষেত্রে তারা শুধু নিরাপত্তা রক্ষাকারী হিসেবেই নয়, বরং মানবিক সহায়ক, শিক্ষক, চিকিৎসক ও পুনর্গঠনের অংশীদার হিসেবেও কাজ করেছেন। দুর্গম এলাকায় চিকিৎসা ক্যাম্প স্থাপন, বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা, শিশুদের জন্য অস্থায়ী বিদ্যালয় চালু, নারীদের সুরক্ষা নিশ্চিতকরণ, রাস্তা ও সেতু নির্মাণ—এসব কর্মকাণ্ড স্থানীয় জনগণের জীবনমান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। এর ফলে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা স্থানীয় মানুষের কাছে আস্থার প্রতীক ও মানবতার দূত হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছেন।
বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রায় ৫,৬০০-এর বেশি বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী জাতিসংঘের বিভিন্ন মিশনে নিয়োজিত রয়েছেন। তারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠার কাজে আত্মনিয়োগ করে চলেছেন। তবে এই শান্তির অভিযাত্রা কেবল গৌরবের নয়, ত্যাগের ইতিহাসেও সমৃদ্ধ। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে দায়িত্ব পালনকালে শত্রুপক্ষের হামলা, সন্ত্রাসী আক্রমণ, ল্যান্ডমাইন বিস্ফোরণ ও বিভিন্ন দুর্ঘটনায় এ পর্যন্ত ১৭৪ জন বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী শহীদ হয়েছেন। এছাড়াও আহত হয়েছেন প্রায় ২৭০ থেকে ২৮০ জন শান্তিরক্ষী।
সম্প্রতি সুদানে ড্রোন হামলায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কর্পোরাল ও সৈনিকসহ ছয় জন শান্তিরক্ষী শাহাদাতবরণ করেন এবং আরও ছয় জন আহত হন। এই হৃদয়বিদারক ঘটনা জাতিকে গভীর শোকাহত করেছে। তাদের আত্মত্যাগ শুধু জাতির হৃদয়েই নয়, বিশ্বশান্তির ইতিহাসেও এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় হয়ে থাকবে। এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, শান্তি প্রতিষ্ঠার পথ কখনোই সহজ নয় এবং বাংলাদেশ সেই কঠিন পথেই দৃঢ় প্রত্যয়ে এগিয়ে চলেছে।
ত্যাগের পাশাপাশি অর্জনেও সমৃদ্ধ বাংলাদেশের শান্তিরক্ষা কার্যক্রম। সততা, শৃঙ্খলা ও পেশাদারিত্বের কারণে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক স্বীকৃতি অর্জন করেছেন। এ পর্যন্ত ছয় জন বাংলাদেশি কর্মকর্তা জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে ফোর্স কমান্ডার এবং সাত জন কর্মকর্তা ডেপুটি ফোর্স কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এটি কেবল ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, বরং বাংলাদেশের সামরিক দক্ষতা, নেতৃত্বগুণ ও কূটনৈতিক সক্ষমতার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি।
লাল-সবুজের পতাকা বুকে ধারণ করে অশান্ত বিশ্বের বুকে যারা শান্তির আলো ছড়িয়ে দিচ্ছেন, সেই সাহসী শান্তিরক্ষীরা বাংলাদেশের গর্ব। তাদের আত্মত্যাগ, নিষ্ঠা, শৃঙ্খলা ও মানবিকতার জন্য জাতির গভীর শ্রদ্ধা চিরদিন অটুট থাকবে। বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশের এই নিরলস ও গৌরবময় অবদান ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার বাতিঘর হয়ে থাকবে।
লেখক: কাজী জীম
শিক্ষার্থী, দ্বাদশ শ্রেণি
বাংলাদেশ বিমান বাহিনী শাহীন কলেজ, ঢাকা

