শতবর্ষ পেরিয়েও বলধা গার্ডেনে জীবন্ত রবীন্দ্রনাথের ‘ক্যামেলিয়া’-র স্মৃতি
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শেষ পর্বের বিখ্যাত গদ্যকবিতা ‘ক্যামেলিয়া’-র পেছনে জড়িয়ে আছে ঢাকার ওয়ারীর বলধা গার্ডেনের স্মৃতি। ১৯২৬ সালে ঢাকা সফরে এসে জয় হাউজে অবস্থানকালে এই বাগানের দুর্লভ ক্যামেলিয়া ফুল কবির মন কেড়েছিল বলে জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানের সরকারি নথিতে উল্লেখ রয়েছে। আগামী ২০২৬ সালে পূর্ণ হচ্ছে সেই ঐতিহাসিক সফরের এক শতাব্দী।
সমালোচকরা ‘ক্যামেলিয়া’-কে ছোটগল্পের সঙ্গে তুলনা করে থাকেন। কবিতায় নায়ক দুষ্প্রাপ্য ফুলটি কমলার আভিজাত্যের চরণে উৎসর্গ করতে চান, কিন্তু কমলা তার মূল্য বুঝতে না পারতে পারে ফুলটি শোভা পায় এক সাঁওতাল মেয়ের কানে। এর মধ্য দিয়ে ফুটে ওঠে উচ্চবিত্তের কৃত্রিম আভিজাত্যের প্রতি মৃদু আঘাত আর প্রকৃতির স্বাভাবিক সৌন্দর্যের বিজয়। ১৯৩২ সালের এই কবিতার সূচনা ট্রামে, শেষে আসে সাঁওতাল পরগণার নির্জনতা, একটি চারা আর অপেক্ষার পরিণতি।
আজ বাগানটি ঘিরে রয়েছে সুউচ্চ ভবন, ব্যস্ত সড়ক, হাসপাতাল আর মেয়র হানিফ ফ্লাইওভার। তবু ভেতরে পা দিলেই বদলে যায় দৃশ্যপট—গাছের ছায়া, পাখির ডাক, পুকুরের জল আর বিরল উদ্ভিদের নীরবতা। শঙ্খনদ পুকুরপাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা জয় হাউজে ১৯২৬ সালে এক রাত কাটিয়েছিলেন কবি। তবে বলধা গার্ডেনের গল্প রবীন্দ্রনাথের আগেই শুরু। নরেন্দ্র নারায়ণ রায় চৌধুরী পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে দুর্লভ উদ্ভিদ সংগ্রহ করে ঘনবসতিপূর্ণ পুরান ঢাকায় গড়ে তুলেছিলেন এক জীবন্ত উদ্ভিদ-সংগ্রহশালা।
আজও বাগানের মালি হাফিজুল ইসলাম স্বেচ্ছায় ঘুরিয়ে দেখান স্মৃতিবিজড়িত স্থানগুলো—কোথায় বিশ্রাম নিয়েছিলেন কবি, কোথায় ফুটেছিল ক্যামেলিয়া। তার কাছে এই গল্প নিছক ইতিহাস নয়, বাগানের পরিচয়েরই অংশ। শতবর্ষের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে বলধা গার্ডেন তাই রয়ে গেছে বাংলা সাহিত্য ও উদ্ভিদবৈচিত্র্যের এক অনন্য মিলনকেন্দ্র।

