খাবারে ভেজাল থেকে নকল ব্র্যান্ড: খাদ্যশিল্পের সামনে কঠিন বাস্তবতা
খাদ্যে ভেজাল, জনপ্রিয় ব্র্যান্ডের নকল পণ্য বাজারে ছাড়া এবং আইনের ফাঁক গলিয়ে ব্যবসা করার প্রবণতা— বাংলাদেশের খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের অন্যতম বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে এসব সমস্যা। বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) দুপুরে রাজধানীর ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সিটি বসুন্ধরায় (আইসিসিবি) বাংলাদেশ অ্যাগ্রো-প্রসেসরস অ্যাসোসিয়েশনের (বাপা) আয়োজনে ফুডপ্রো ইন্টারন্যাশনাল এক্সপোর ১১তম আসরের ‘বাংলাদেশ ফুড ইন্ডাস্ট্রি: চ্যালেঞ্জেস অ্যান্ড ওয়ে ফরোয়ার্ড’ শীর্ষক টেকনিক্যাল সেশনে বিশেষজ্ঞরা এমন অভিমত ব্যক্ত করেন। সেশনে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. ইকবাল রউফ মামুন।
ড. মামুন বলেন, কোনো পণ্য মানুষের ভালোবাসা পেলেই শুরু হয় তার নকল উৎপাদনের খেলা। জিঞ্জিরা থেকেই মূলত এমন তৎপরতার সূচনা হয়, যেখানে একই ধরনের মোড়ক ব্যবহার করে হুবহু একরকম পণ্য তৈরির ঘটনাও ঘটে। তাঁর ভাষায়, আইনের অসৎ ব্যবহারের সুযোগও রয়ে গেছে— নামের বানানে সামান্য পরিবর্তন এনে অন্য প্রতিষ্ঠানের পণ্যের মতো সামগ্রী বানিয়ে লাইসেন্সও পেয়ে যাওয়া যায়। এতে প্রকৃত ও মানসম্মত খাদ্য উৎপাদনকারীরা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়েন, ব্যবসায়িক ক্ষতির মুখে নিরুৎসাহিত হন। অতিরিক্ত মুনাফার লোভে খাদ্যে ভেজাল মেশানোর প্রবণতাকেও দেশের জন্য বড় হুমকি বলে মনে করেন এই অধ্যাপক।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের মানুষ এখনো বিশ্বাস করে, বাংলাদেশের খাবার মানেই ভেজাল। সবকিছুতেই ভেজাল— এমন ধারণা দেশের খাদ্যশিল্পকে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিয়েছে; এই কলঙ্ক দূর করতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। খাদ্য পরিদর্শন ব্যবস্থা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। তাঁর মতে, দেশে যতটা খাদ্য পরিদর্শন হয়, তার চেয়ে বেশি হয় হয়রানি। বিশ্বজুড়ে যেখানে ঝুঁকিভিত্তিক (রিস্ক-বেইজড) পরিদর্শন ব্যবস্থা চালু হয়ে গেছে, বাংলাদেশ এখনো আটকে আছে চূড়ান্ত পণ্যভিত্তিক পদ্ধতিতে। কাউকে বিপদে ফেলা কোনোভাবেই সৎ উদ্দেশ্য হতে পারে না বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সেশনে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের পরিচালক মিস উজমা চৌধুরী বলেন, ফুড সিস্টেম ম্যানেজমেন্টের পদ্ধতি এক পণ্য থেকে আরেক পণ্যে আলাদা হওয়ায় এর বাস্তবায়ন অত্যন্ত জটিল হয়ে দাঁড়ায়। প্রতিষ্ঠানগুলো চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, তবে অনেক সময় সঠিক কৌশল সম্পর্কে ধারণা না থাকায় কাঙ্ক্ষিত ফল মেলে না। বিশেষজ্ঞদের অভিমত, ভেজালমুক্ত ও নিরাপদ খাবারের বিশ্বাসযোগ্য ভাবমূর্তি গড়ে তুলতে না পারলে দেশের খাদ্যশিল্পের সম্ভাবনা বাধাগ্রস্ত হবে। তাই পরিদর্শন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং নকল ব্যবসার বিরুদ্ধে কঠোর নজরদারি এখন সময়ের দাবি।

