বম্বের নায়িকা থেকে পাকিস্তানের সুরের রানি, নূর জাহানের জীবন রূপকথার মতো
উপমহাদেশের শিল্পকলার ইতিহাসে এমন কিছু মুখ আছে, যাদের কথা সহজে ভোলা যায় না। নূর জাহান তেমনই এক অবিস্মরণীয় নাম। বম্বের চলচ্চিত্রে নায়িকা হিসেবে জনপ্রিয়তা কুড়িয়েও জীবনের দ্বিতীয় পর্বে তিনি হয়ে ওঠেন পাকিস্তানের সংগীতজগতের শিরোমণি। অভিনয়, গান কিংবা পরিচালনা — প্রতিটি ক্ষেত্রেই নিজস্ব স্বতন্ত্র ছাপ রেখে গেছেন এই মেধাবী শিল্পী। তার জীবনের গল্পে মেশানো আছে রহস্য, চড়াই-উৎরাই আর নাটকীয়তা, যা রূপকথাকেও হার মানায়। বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, কিংবদন্তি গায়িকা লতা মঙ্গেশকর নিজেই নূর জাহানকে আদর্শ বলে মেনে নিয়েছিলেন।
১৯২৬ সালের ২১ সেপ্টেম্বর পাঞ্জাবের কাসুর শহরে তার জন্ম। সুফি কবি বাবা বুল্লে শাহর জন্মস্থান হিসেবে পরিচিত এই শহরেই বেড়ে ওঠা নূর জাহান মাত্র পাঁচ বছর বয়সে গান গাওয়া শুরু করেন। সংগীতের প্রাথমিক দীক্ষা মেলে উস্তাদ বড় গুলাম আলী খানের কাছে। শৈশব থেকেই মঞ্চে গান ও অভিনয়ের দিকে ঝোঁক তৈরি হয় তার, আর শিশুশিল্পী হিসেবেই পর্দায় অভিষেক ঘটে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কণ্ঠস্বর হয় আরও পরিণত, গড়ে ওঠে বহুমুখী প্রতিভার পরিচয়। হিন্দি, উর্দু, সিন্ধি ও পাঞ্জাবিসহ একাধিক ভাষায় গান গেয়েছেন তিনি।
অল্প বয়সেই চলচ্চিত্রে যুক্ত হওয়া নূর জাহানের কর্মজীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয় ১৯৪২ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত হিন্দি ছবি ‘খানদান’। ওই সিনেমায় অভিনয়ের পাশাপাশি নিজের কণ্ঠে গানও পরিবেশন করেন তিনি, আর সৌন্দর্য, অভিনয় ও কণ্ঠের জাদুতে একেবারে হয়ে ওঠেন দর্শকনন্দিত। এরপর বম্বেতে টানা কাজের ধারা শুরু হয়; দিলীপ কুমার অভিনীত ‘জুগনু’ ছবিও তার জনপ্রিয়তার সিঁড়ি আরও উঁচু করে। তবে পেশাগত সাফল্যের পাশাপাশি ব্যক্তিজীবনেও নেমে আসে ঝড়ঝাপটা। ‘খানদান’-এর পরিচালক শওকত হুসেন রিজভির সঙ্গে সেটেই গড়ে ওঠে প্রেম। প্রযোজক পক্ষের আপত্তি, রিজভির বিরুদ্ধে অপহরণের মামলা এমনকি পরিবারের কঠোর বিরোধিতাও তাদের আটকাতে পারেনি। আদালতে নূর জাহান অভিযোগ অস্বীকার করেন, আর শেষমেশ দুই পরিবারের অমতে গোপনে রিজভিকেই বিয়ে করেন তিনি।
জীবনের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আসে ১৯৪৭ সালের দেশভাগের মধ্য দিয়ে। জন্মভূমি পাঞ্জাবের টানে ভারত ছেড়ে পাকিস্তানে পাড়ি জমান নূর জাহান। নতুন দেশে শুরুর পথটা মোটেও মসৃণ ছিল না, সামনে আসে নানা প্রতিকূলতা। তবু অসাধারণ প্রতিভা আর কঠোর পরিশ্রমে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন ‘সুরের রানি’ খ্যাতিতে। ফৈজ আহমেদ ফৈজের লেখা কালজয়ী ‘মুঝসে পেহলি সি মহব্বত’ গানটি আজও শ্রোতাদের মনে বেঁচে আছে। ভারতে অনেকে তাকে ‘পাকিস্তানের লতা মঙ্গেশকর’ বললেও পাকিস্তানে তার অবস্থান ছিল আরও উঁচুতে। চলচ্চিত্র ও সংগীতের বুকে তার রেখে যাওয়া অবদান দীর্ঘদিন অনুপ্রেরণা জুগিয়ে যাবে আসন্ন প্রজন্মের শিল্পীদের।

