শামসুর রাহমানের কবিতায় রাজনীতি

কবিতা হলো সময়ের সবুজ বাগানের বৃক্ষরাজ। যা বিকাশ বৃদ্ধির দীঘর্ ইতিহাস বহন করে। পরিবার, সমাজ, জাতিগোষ্ঠীর জাগ্রতসত্তায় সময়ে সুবিচারে সবুজাভ রূপ লাভ করে। সে ঘ্রাণ ছড়ায় মানুষের বুদ্ধিভিত্তিক মেধা ও মননের চাষাবাদে। উন্নত অধিকার নিশ্চিত করে গড়ে তোলে শক্তিমান নাগরিক। বিস্তৃত হয় শোভিত জনপদ। বলতে দ্বিধা নেই শামসুর রাহমান সে পথের নিমার্তা তাই কবি রাজনীতির কড়া ঘ্রাণে এঁকেছেন নাগরিক সুলভ মাতৃপ্রতিম, তৈরি হয়েছে অধিকার প্রোথিত ছায়াঘেরা মায়ামাখা উবর্র কবিতার ভ‚মি।
নাগরিক কবি শামসুর রাহমান, জন্ম ২৩ অক্টোবর ১৯২৯ মাতুয়াতুলি ঢাকা, মৃৃত্যু ১৭ আগস্ট ২০০৬ বাংলা কবিতার সঙ্গে যার বসবাস তার কবিতার অনুষঙ্গ হলো প্রেম প্রকৃতি, পরিবেশ পরিস্থিতি, ভাষা আন্দোলন মহান মুক্তিযুদ্ধ স্বাধীনতা বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ। পাশাপাশি সমকালীন রাজনীতিও বহুমাত্রিক দশের্ন কবিতার জলরঙে ধরা দিয়েছে। আইয়ুব শাসন ও শোষণের সময় মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী ও জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্ব উদ্যমী ভাবগাম্ভীযর্ জনতার মনস্তুত্তি¡ এসব দেখেই তিনি রাজনৈতিক কবিতায় মনোনিবেশ করেন। যদিও কারও কারও ভাবনা সাহিত্যচচার্ রাজনীতি নয়, তার কথা হলো সাহিত্যিকরা তো অন্য গ্রহের প্রাণী নয় তাদের ভাবনায় রাজনীতি ভর করা স্বাভাবিক। সে চিন্তা-চেতনা থেকেই তার কোনো কোনো কবিতা রাজনৈতিক আদলে রচিত হয়েছে। তৈরি হয়েছে সাহিত্যের ভিন্নধমীর্ শিল্প। শিল্পের রূপ কাঠামোতে কবিতার সৃজনধমির্তায় উঠে এসেছে রাজনৈতিক বাস্তবতা। রাজনৈতিক কবিতা নিয়ে গ্রন্থিত হয় একটি কবিতার বই। তরুণ বন্ধু মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর ও প্রকাশক মাহফুজুল হকের অনুরোধে রচনা করেন রাজনীতিবিষয়ক কবিতা।

শামসুর রাহমানের রাজনৈতিক যে কবিতাগুলো জনমনে নাড়া দেয় ও চেতনায় উজ্জ্বীবিত করেÑ বণর্মালা, আমার দুঃখিনী বণর্মালা, ফেব্রæয়ারি ১৯৬৯, হরতাল, আসাদের শাটর্, তোমাকে পাওয়ার জন্য হে স্বাধীনতা, স্বাধীনতা তুমি, স্বাধীনতা একটি বিদ্রোহী কবিতার মতো, পোস্টার, মাইক, ইলেকট্রার গন, বাংলাভাষা উচ্চারিত হলে, শহীদ মিনারে কবিতা পাঠ, কালদীণর্ কোকিলের মতো, গজের্ ওঠো স্বাধীনতা, ¯েøাগান ইত্যাদি।

রাজনীতিবিষয়ক কবিতার মধ্যে রূপক উপমা বা প্রতীকী চিত্রে কমের্র ব্যবহার ও লক্ষণীয়। জীবজন্তুবিষয়ক রাজনীতির প্রতীকী কবিতা হলোÑ মেষমন্ত্র, হাতির শুঁড়, উদ্ভট উটের পীঠে চলেছে স্বদেশ, কালোত্তীণর্ কোকিলের মতো ইত্যাদি। জীবজন্তুর প্রতীকায়নে কবিতায় তুলে ধরা হয়েছে ক্ষমতার অপব্যবহার জনরোষ, বিভ্রান্তি, জীবন্ত মানুষের প্রাণনাশ, ধান্ধা ঠকামি ভেল্কিবাজি, স্বপ্নের গাডাকা, অসন্তোষ, নোংরা গালি, অলংকারহীন গান, একাকিত্বের দংশন, রাষ্ট্রীয় শাসন শোষণ আইনের খড়গ। দলিত, মথিত, নিস্তরঙ্গ মানুষের যাপিতজীবনও এসেছে বহুমাত্রিক রূপক ও প্রতীকায়নে।

‘মেষতন্ত্র’ কবিতায় মেষ ও মালিক দুটো বিষয় এসেছে শাসক ও জনতার পথিকে, জনতা কথা বলতে পারে না; তাদের মুখ বোবা তারা শাসকের হুকুম পালন করে অথচ এই জনতাই রাষ্ট্রের মুখ উজ্জ্বল করে। কিন্তু কী নিদারুণ পরিস্থিতি দিনদুপুরে চলে যাচ্ছে জনতার জীবন টুঁ শব্দ করতে পারে না। জনতা শাসকের শোষণে অতিষ্ট ও নিরুপায়। হাতির শুঁড় কবিতায় স্বাধীন সাবের্ভৗম রাষ্ট্রের অবস্থা জনতার বিপযর্য়ও নানা পরিস্থিতি এসেছে ইতিহাস সচেতনতায়Ñ ‘শঙ্খমালা ঘুমন্ত ভোমরা মরে জীবন্ত রাষ্ট্রনায়কের খেয়ালখুশি মতো’।

জনতা ভিক্ষার ঝুলি কঁাধে ঘুরে বেড়ায় সন্ধ্যার আগমনে বনে যায়। আর কতার্ব্যক্তি সম্পদের পাহাড় বানায়। এ সময়ে ভেলকিবাজি ধান্দা ও চতুরামীর কারণে কে সাধু, কে অসাধু, কে তস্কর, কে লস্কর চেনা অসম্ভব হয়ে যায়। মনে হচ্ছে হরিলুট, চারদিকে অভিভাবকহীন খলনায়কের দ্বারা শোসিত মানুষ ও সামষ্টিক সমাজব্যবস্থা। ‘উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ’ কবিতায়-মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে আসে স্বাধীনতা। যে দেশের আপামর জনগণ যুদ্ধ করেছে নিজস্ব ভাষা, সমাজ, সংস্কৃতি জাতিসত্তা অথর্নীতি ও অধিকারের আশায়। কোথা থেকে নেমে এলো আকস্মিক শাসকের ছোবল। রাষ্ট্রে নেমে এলো অগণতান্ত্রিক নীল বেজার। এ দেশটা যেন কারও নয়, চারদিকে নিশিদিন। মানুষের মুখগুলো শিম্পাঞ্জি, রক্ত আভায় বসে সবে গায়Ñ ‘ঐরাবতের খেয়ালখুশির ধান্দায়/ভোরে ফকির মুকুট পরে সন্ধ্যায়/প্রাক্তন সেই ভেলকিবাজির মন্তরে/যাচ্ছে চেনা অনেক সাধু সন্তরে’।

ভাষা আন্দোলন স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধ তার কবিত্বময় স্পন্দিত ফসলের মাঠ যা বিভিন্নমুখী হয়ে ধরা দিয়েছে কয়েকটি কবিতায়Ñ বণর্মালা, আমার দুঃখিনী বণর্মালা ফেব্রæয়ারি ১৯৬৯, তোমাকে পাওয়ার জন্য হে স্বাধীনতা, স্বাধীনতা তুমি, স্বাধীনতা একটি বিদ্রোহী কবিতার মতো, গজের্ ওঠো স্বাধীনতা ইত্যাদি। এতে অস্তিত্বসঙ্কট, স্বাধীনভাবে বসবাস, মনের ভাষা ব্যবহার, জীবনধারণের চিন্তা, আজন্ম সাথী, স্বপ্নময়তার চৈতন্য, সত্তার খোরাক, জনতার জাগরণ ঠেকাতে শাসকের ভেলকিবাজি এবং দেশগ্রামে মানুষের জীবনের গতি-প্রকৃতি চেতনার মৌল নিভর্রতা বহুমাত্রিক অবয়বে এসেছে। গতি ও স্থায়িত্বের পথে এগিয়েছে দেশ ও মানুষ।

মায়ের মমতাস্পশের্ ঘিরে আছে শ্যামল বাংলার রূপ ও বৈচিত্র্য। সে গঁায়ের নিবিড় বন্ধনে টিকে আছে তার সন্তানেরা। এ সম্পকর্ চিরায়ত ও নিবিড়। সৃষ্টির প্রত্যয়ে নানান সমস্যাকে উগরে দেয়, জাগায় মানুষ। এ তো আত্মার সাথে দেহের, দেহের সাথে আত্মার, দুয়ের সুনন্দ মেরুকরণ। ভাষাকে উপড়ে নিলে কী থাকে দেহে, মনে সবই নিশ্চেতন। ভাষার গায়ে অঁাচড় লাগলে ছিন্ন হয় সত্তা বিগলিত হয় দেহ। এ ভাষার রয়েছে বায়ান্নর মতো ইতিহাস সেই ভাষাকে নিয়ে চলে নোংরামি তাই কবি আক্ষেপ করেন কবিতাচয়নে-‘ সে-ফুলের একটি পাপড়িও ছিন্ন হ’লে আমার সত্তার দিকে/কতো নোংরা হাতের হিংস্রতা ধেয়ে আসে।/এখন তোমাকে নিয়ে খেঙরার নোংরামি/এখন তোমাকে ঘিরে খিস্তি-খেউড়ের পৌষমাস!/তোমার মুখের দিকে আজ আর যায় না তাকানো/বণর্মালা, আমার দুঃখিনী বণর্মালা’।

‘ফেব্রæয়ারী ১৯৬৯’-এ কবিতাটি চেতনামূলক কবিতা। কবিতার প্রতিটি শব্দ যেন এক একটি প্রতিচিত্র। বাঙালির চেতনাকে জাগ্রত করে মনকে মসৃণ করে, মনে পরিবতের্নর ধ্বনি উৎসারিত হচ্ছে। হ্যঁা সেই উৎসারণের চিহ্ন বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন ঝঁাপিয়ে পড়া সালাম, বরকত। বরকতের মতো তরুণ ভাষাসৈনিকের আত্মত্যাগের রক্তচিহ্ন কৃষ্ণচ‚ড়া রঙের মতো দীপ্যমান হয়েছে শ্যামল পূবর্বাংলা। সেই বায়ান্নর বীজ থেকে কচি কচি প্রাণ ভিড় করেছে মুক্তির মিছিলে, তার হৃদয়মাঠে চযার্পদের হরিণী বিন্যাস, রাবীন্দ্রিক ধ্যান, যেন এক একটি নতুন বিন্যাস, স্বপ্নের গগনে নক্ষত্রের মতো এক একটি চেতনার নিযার্স। ধীরে ধীরে চেতনার রৌদ্রতেজ উদীয়মান তরুণ, শ্রমিক, ছাত্র, কৃষক, প্রেমিক, এ যেন সমকেন্দ্রিক অবস্থান। দুঃখিনী বণর্মালার গাঢ় উচ্চারণ, রক্তশানিত উদ্যম, রক্ষাবন্ধনের মানবিক বাগান। সে আনন্দ আর উত্তেজনায় জেগে উঠেছে গোটা দেশ ও মিশ্রিত এবং মানুষ। ‘আবার ফুটেছে দ্যাখো কৃষ্ণচ‚ড়া থরে থরে শহরের পথে/কেমন নিবিড় হয়ে। কখনো মিছিলে কখনো-বা/একা হেঁটে যেতে যেতে মনে হয়Ñ ফুল নয়, ওরা/শহীদের ঝলকিত রক্তের বুদ্বুদ, স্মৃতিগন্থে ভরপুর/একুশের কৃষ্ণচ‚ড়া আমাদের চেতনারই রঙ (কবিতা- ফেব্রæয়ারী ১৯৬৯)।

কবিতা কালের বৃক্ষাদি এখানে মাখা থাকে ছায়াঘেরা মানবসমাজ। পত্রে পত্রে সাজানো থাকে সময়ের পসরা মাটি, বৃক্ষ ও ছায়া, রাষ্ট্র সমাজ ও মানুষের মতো এটি ত্রিবেণি সঙ্গম। এ মানুষ কখনো বিহঙ্গ মুক্তভাবে চলতে পছন্দ করে। বাংলার মানুষ তা থেকে আলাদা নয় কিন্তু পরশ্রীকাতরা তাদের বিনষ্ট করে। দুমড়ে দেয়, মানুষের কণ্ঠস্বর, ব্যক্তিক স্বাথর্ হানা দেয় বাঙালির তাজা প্রাণে, শেষ করতে উদ্যত বাংলার ভ‚মি। সে নিরিখে একদিন নিসঙ্গ রাতের মধ্যে নেমে আসে তুমুল অন্ধকার। মানবিক বাগানে অমানবিক প্রাণী মাড়ায়, জনতা-জেগে ওঠেÑ ‘তোমাকে পাওয়ার জন্য হে স্বাধীনতা, তোমাকে পাওয়ার জন্য/ আর কতবার ভাসতে হবে রক্তগঙ্গায়?/আর কতবার দেখতে হবে খাÐবদাহন/স্বাধীনতা, তোমার জন্যে এক থুত্থুরে বুড়ো/ উদাস দাওয়ায় বসে আছেনÑ তার চোখের নীচে অপরাহ্ণের/দুবর্ল আলোর ঝিলিক, বাতাসে নড়ছে চুল’।

স্বাধীনতা প্রাপ্তির বিশদ ইতিহাসচিত্র রয়েছে তা লাভে বাঙালির বারবার বিপযর্স্ত হয়েছে। যেমনÑ কাব্য প্রতিভায় বাংলার মাঠ-ঘাট, সকিনা বিবি, হরিদাসী, ছাত্র জনতা, তৃষিত শিশু, হাড্ডিসার কিশোরী, কৃষক রিকশাচালক, মাঝি, তাদের কিছুই লাভে ইচ্ছে নেই শুধু ভিটেমাটি আশ্রম। আবাদি ভ‚মি। এ ভ‚মি তাদের তারাই কৃষক তারাই শ্রমিক, একটা আশা তাদের সেই আবাদি জমির কোণে একটি শুকনো বাসা সঁাটানো হবে তাতে পতপত করে উড়বে দেশের পতাকা। ‘হাড্ডিসার এক অনাথ কিশোরী শূন্য থালা হাতে বসে আছে পথের ধারে এমন দুঃসহ বিকৃত দীঘর্ ইতিহাসগোটা বিশ্বে কোথাও রচিত হয়নি অথচ জীবে দয়া করে যেজন সেজন সেবিচে ঈশ্বর, তার কবিতায় স্বাধীনতার বণর্নার পাশাপাশি তা কামনায় কবি মনে করেন জলে, বৈঠায়, কাস্তে, জীবনে, যৌবনে লাবণ্য তোমাকে আসতেই হবে এমন দৃঢ় চিন্তশৈলী কোনো কবির দেখা যায়নি বলা যায় কবি এখানে আপন শৈলীতে দৃশ্যমান তাই তিনি কবিতার জাদুকর। মনে করা হয়Ñ যে কবিতা জাগায় যে কবিতা ভাসায়, যে কবিতা প্রাণ সঞ্চার করে, যে কবিতা এনে দেয় জাতীয়তা বোধ, সেই কবিতার জনক কবি শামসুর রাহমান।

প্রচার মাধ্যমে বেশ পরিবতর্ন হলেও সাম্প্রতিককালে মাইক পোস্টার ব্যানার প্রচার মাধ্যম হিসেবে এখনো গুরুত্ব বহন করছে। শহরের অলিগলি হোটেল রেস্তোরঁা, দোকানপাটে পোস্টারজুড়ে সয়লাব। বারো মাসই শহর ঢাকা থাকে পোস্টারে আর ফেস্টুনে। চলতি পথিক, তরুণ, দপ্তরের নানা কমর্চারী, সিনেমাগামী তন্বী, ফেরিওয়ালা, দুস্থ বুড়ো, সবাই হঁা করে একপলক দেখে নেয়, সবাই পাঠকও বটে-কবির ইচ্ছে এবং দাবি

‘আমার একান্ত দাবি

চাই তাকে চাই, শুধু তাকে উৎসবে দুভির্ক্ষ রাষ্ট্রে-

বিপ্লবে তাকেই চাই সবর্দাই।’

অস্তিত্ব সঙ্কট উত্তরণের মারণাস্ত্রও কবিতা। হিংসা, বিদ্বেষ, লোভ-লালসা, মানব প্রকৃতির রিপুগত বৈশিষ্ট্য। এগুলোর কারণে স্বদেশ প্রেম মানবপ্রেম জাতীয়তাবোধ থমকে যায়। জীবনে অন্ধকার নেমে আসে। অশান্তি, ভোগান্তি, অস্বস্তি ও বিরাজ করে। নর-নারী নানা শ্রেণিতে বিভক্ত হয়। সম্প্রীতি, গণতন্ত্র, গুঁড়ো দুধ, পরাভ‚ত হয়ে হত্যা গুম, খুন, রাহাজানি লুটপাট জ্বালাওপোড়াও, খাদ্যে ভেজাল রাসায়নিক দ্রব্যমিশ্রণ ছিল, অবাধে এখনো চলছে। জাতির সাবির্ক কল্যাণ আনয়ন ও যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত গ্রহণ সময়ের দাবি যে দাবি আদায়ে শামসুর রাহমানের কবিকণ্ঠ ছিল বারুদ মিশ্রিত ‘দেবে না, তোমরা দেবে না’। ‘স্বপ্নের দ্বীপে হঁাটতে/সোনালী শস্য কাটতে/দেবে না, তোমরা দেবে না’।

জাগ্রত সত্তার কবিতা, ‘বুক তার বাংলাদেশের হৃদয়’, ‘আর যেন না দেখি ৯০-এর গণঅভ্যুত্থান’ ও ‘গজের্ ওঠো স্বাধীনতা’ এ শহীদ নূর হোসেনের চরিত্রেরাদলে অধিকার সচেতন কবিতা। ‘গজের্ ওঠো স্বাধীনতা’ কবিতা- ‘বীর যুবা নূর হোসেনের শাহাদাতের দোহাই/দিগন্ত কঁাপিয়ে ক্রুদ্ধ টাইটানের মতোই আজ/হাতের শেকল ছিড়ে ফেলে/গজের্ ওঠো, গজের্ ওঠো তুমি স্বাধীনতা।

কৃষ্ণনাঙ্গ চাদরে আবৃত ঢাকা শহর ছায়ার ভেতরে ছায়া, স্বৈরশাসকের অগ্নিময় তাÐবদাহ, ভেতরে, ছায়া, ভেতরে দপদপ করছে অধিকার। উদ্যমী নূর হোসেন জীবনানন্দের নৈসগির্ক কবিতার মতো তার মনে অঁাটে সবুজের ঘ্রাণ, সূযর্ ওঠে সবার অলক্ষে। নিভীর্ক যোদ্ধা, উদোম, পিচঢালা পথে মেখে যায়, রৌদ্রের অক্ষরে ¯েøাগান হয়ে ওঠে অনন্য। ‘¯েøাগান বীরবেশে মিছিলের সম্মুখে হঁাটলে হঠাৎ শোনা যায়/নূর হোসেনের বুক নয় ও বাংলাদেশের হৃদয়/ ফুটো করে দেয় বাংলাদেশ’। নূর হোসেন স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের প্রতীক। তার বুক থেকে বনপোড়া হরিণীর মতো রক্ত ঝরে অবিরত তার আতর্নাদ স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে। সে থেকেই নূর হোসেন দিবস পালিত হয়ে আসছে।

বিদ্রোহ চেতনায় নজরুল বীজ হলে শামসুর রাহমান লতাগুল্ম। স্বাধীনতা তুমি ও স্বাধীনতা একটি বিদ্রোহী কবিতার মতো তার অনন্য কবিতা বলা চলে চুম্বকীয় কবিতা। তার ব্যক্তি মানসে ঘুমন্ত বা তন্দ্রাচ্ছান্ন বাঙালির প্রাণে এক আশার বাতাস। তিনি আলতো হাতে মসৃণভাষায় স্বাধীনতা ধীরে ধীরে তার চেতনার জনপদে নজরুলের ঝঁাকড়া চুল, রবিঠাকুরের অবিনাশী গান, শহীদমিনার, যুবা গ্রাম্য মেয়ে, সতেজ ভাষণ, খঁা খঁা মাঠ, তরুণ শিক্ষাথীর্, কালবৈশাখীর ঝাপটা নিস্তেজ বারুদের বিস্ফোরণ, বাঙালি মনের আবেগ অনুভ‚তি চিত্রগল্পের ভঙ্গিতে মুক্তির দৃষ্টিতে চিত্রিত হয়েছে। কবির প্রতিটি শব্দই ইতিহাস ঐতিহ্য ধারিত ভাবনালোক। স্বাধীনতা একটি বিদ্রোহী কবিতার মতোÑ কবিতায় সত্যিই বিদ্রোহ চেতনার ফসিলছায়া। এ কবিতায় স্বেচ্ছায় গৃহবন্দি মানুষ। স্কুল ঘরে গাদাগাদি হয়ে সংসার করছে তারা। কতদিন এভাবে চলবে। একটা বিহিতের জন্য তারা বিদ্রোহ করছে। অন্যদিকে বদমেজাজি অথার্ৎ রাজাকার মানুষকে শাসাচ্ছে। এ দেশ এখন ধংসের ভ‚মি। ‘প্রথম চিৎকার জেগে ওঠে/মনে হয়, স্বাধীনতা একটি বিদ্রোহী কবিতার মতো/তুমুল ঘোষণা করে অলৌকিক সজীব সংবাদ।’

টিক্কাখানের স্বৈরাচারী চিত্র এঁকেছেন বাংলার খিড়কিতে বসে। তার চিত্রনেÑ তরুণেরা কানামাছি করছে শেয়ালের-শকুনের চাটানো রাত, ভয়ানক ঢাকা, আতঙ্কিত দেশ, কম্পিত জনস্রোত এবং বেয়নেবিদ্ধ আমার ভাইয়ের দেহ, বেহুলা লখিন্দরের সেই মনসামঙ্গলের কাহিনী গ্রথিত করে চেনার বলয় নিমার্ণ করেছেন। প্রাণে ছিল চেতনার শ্বাস। তাই কবিতায় এসেছে বিদ্রোহী আগুন। এটি কী কবি মনের দায়বদ্ধতা।

কবিতা নগরের গলি, দুপাশের সুরম্য ইমারতের মতো তার ভিতরে জনতার বসবাস, অধিকার বঞ্চিত সে জনতার পাশে কবি নাগরিক কবি হিসেবে পরিকল্পনার মাধ্যমে অধিকার সচেতনতা ও নগরের বিষয়কে নানাবিধ চিত্রকল্প উপমায় আপন সৃষ্টিতে তুলে ধরেছেন। তার কবিতা হয়ে ওঠে সাবের্ভৗম দেশের মতো সৌন্দযর্ভ‚মি।

কবিতা হলো সময়ের সবুজ বাগানের বৃক্ষরাজ। যা বিকাশ বৃদ্ধির দীঘর্ ইতিহাস বহন করে। পরিবার, সমাজ, জাতিগোষ্ঠীর জাগ্রতসত্তায় সময়ে সুবিচারে সবুজাভ রূপ লাভ করে। সে ঘ্রাণ ছড়ায় মানুষের বুদ্ধিভিত্তিক মেধা ও মননের চাষাবাদে। উন্নত অধিকার নিশ্চিত করে গড়ে তোলে শক্তিমান নাগরিক। বিস্তৃত হয় শোভিত জনপদ। বলতে দ্বিধা নেই শামসুর রাহমান সে পথের নিমার্তা তাই কবি রাজনীতির কড়া ঘ্রাণে এঁকেছেন নাগরিক সুলভ মাতৃপ্রতিম, তৈরি হয়েছে অধিকার প্রোথিত ছায়াঘেরা মায়ামাখা উবর্র কবিতার ভ‚মি।

শেয়ার করুণঃ

shares