তিতাসের সৌন্দর্যে বিমুগ্ধ বরেণ্য ব্যক্তিদের কথামালা

মেঘনা কন্যা তিতাসের অপরূপ সৌন্দর্যে বিমোহিত হয়েছেন অনেকেই।বিশেষভাবে,তিতাসের জলে সাতার কেঁটে যাদের শৈশব কেটেছে,যাদের শরীরে এখনো তিতাসের ঘোলা জলের দাগ লেগে আছে,যাদের চুলে লেগে আছে তিতাসের পলি মাটি,তিতাসের গাংচিলদের সাথে যাদের আমরণ বন্ধুত্ব। এমন কয়েকজনের নাম না বললেই নয়,

অদ্বৈত মল্লবর্মণ, জন্ম ব্রাহ্মণবাড়িয়ার গোকর্ণঘাটে।অদ্বৈত মল্লবর্মণের সমগ্র সাহিত্যিক জীবনে ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ উপন্যাসটি অমর কীর্তি হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। প্রতিকূল সংঘাতে ক্রমশ মুছে-আসা মৎস্যজীবী যে মানুষদের কাহিনী এই উপন্যাসে বর্ণিত হয়েছে তিনি সেই ‘মালো’ সম্প্রদায়েরই লোক ছিলেন। তিনি তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও সুগভীর অন্তঃদৃষ্টির কারণেই উপন্যাসটিতে ধীবর সমাজের নিষ্ঠুর জীবনসংগ্রামের সাধারণ কাহিনীকে দিয়েছেন অবিনশ্বর ও অসাধারণ।

 

উপন্যাসটির ভূমিকাংশে তিনি লিখেছেন,

“ তিতাস একটি নদীর নাম। তার কূলজোড়া জল, বুকভরা ঢেউ, প্রাণভরা উচ্ছ্বাস। স্বপ্নের ছন্দে সে বহিয়া যায়। ভোরের হাওয়ায় তার তন্দ্রা ভাঙ্গে, দিনের সূর্য তাকে তাতায়; রাতে চাঁদ ও তাঁরারা তাকে নিয়া ঘুম পাড়াইতে বসে, কিন্তু পারে না। ”

তিতাস নদী ও তার দু’কূলের মানুষের জীবনযাত্রাকে ঘিরে রচিত ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ উপন্যাসে কিশোর, সুবল, অনন্ত, বনমালী প্রমুখ চরিত্রগুলো স্থান পেয়েছে। উপন্যাসটির সামগ্রীক মূল্যায়ন ও বিচার-বিশ্লেষণ করেছেন অদ্বৈত মল্লবর্মণের জীবনীকার অধ্যাপক শান্তনু কায়সার। তাঁর মতে,

“ ‘তিতাস জীবনের শেকড় প্রাকৃত জীবনের গভীরে প্রোথিত। এই প্রাকৃত জীবনকে বাইরে থেকে যতই সরল দেখাক এর ভেতরে প্রবেশ করলে দেখা যাবে, তা বহু ভঙ্গিমা ও বৈচিত্র্যের অধিকারী। ”

অামরা অাজ যে তিতাসকে একনামে জানি এটা কেবল তাঁরই অবদান।

১৯৭২ সালে বাংলাদেশে আসেন তৎকালীন অন্যতম পরিচালক ঋত্বিক ঘটক,তাঁর উদ্দেশ্য ছিল ‘পদ্মা নদীর মাঝি ‘ উপন্যাস অবলম্বনে চলচ্চিত্র নির্মাণ করা।কিন্তু হঠাৎ করেই তাঁর হাতে আসে ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ নামক উপন্যাসটি।তিতাসের সৌন্দর্যে তিনি বিমোহিত হয়ে বলেন,

তিতাস পূর্ব বাংলার একটা খণ্ডজীবন, এটি একটি সৎ লেখা। ইদানীং সচরাচর বাংলাদেশে (দুই বাংলাতেই) এ রকম লেখার দেখা পাওয়া যায় না। এর মধ্যে আছে প্রচুর নাটকীয় উপাদান, আছে দর্শনধারী ঘটনাবলী, আছে শ্রোতব্য বহু প্রাচীন সঙ্গীতের টুকরো – সব মিলিয়ে একটা অনাবিল আনন্দ ও অভিজ্ঞতার সৃষ্টি করা যায়। ব্যাপারটা ছবিতে ধরা পড়ার জন্য জন্ম থেকেই কাঁদছিল। … অদ্বৈতবাবু অনেক অতিকথন করেন। কিন্তু লেখাটা একেবারে প্রাণ থেকে, ভেতর থেকে লেখা। আমি নিজেও বাবুর চোখ দিয়ে না দেখে ওইভাবে ভেতর থেকে দেখার চেষ্টা করেছি। অদ্বৈতবাবু যে সময়ে তিতাস নদী দেখেছেন, তখন তিতাস ও তার তীরবর্তী গ্রামীণ সভ্যতা মরতে বসেছে।  তিনি এর পরের পুণর্জীবনটা দেখতে যাননি। আমি দেখাতে চাই যে, মৃত্যুর পরেও এই পুণর্জীবন হচ্ছে। তিতাস এখন আবার যৌবনবতী। আমার ছবিতে গ্রাম নায়ক, তিতাস নায়িকা।অার এজন্যই অামি ‘পদ্মা ছেড়ে আমি তিতাসে চলে গেলাম’।১৯৭৩ সালে তিনি নির্মাণ করেন তৎকালিন অন্যতম চলচ্চিত্র ‘তিতাস একটি নদীর নাম’।

সত্যিই তিতাস এখন যৌবনবতী।

আল-মাহমুদ, বর্তমানের একজন বিখ্যাত কবি এবং সাহিত্যিক।যার জন্ম ব্রাহ্মণবাড়িয়ার দক্ষিণ মোড়াইলে।যিনি তার বিভিন্ন কবিতা এবং উপন্যাসে তিতাসের সৌন্দর্য তুলে ধরেছেন নিপুনতারসহিত।কবির ভাষায়,

“আমার কেবল ইচ্ছে জাগে

নদীর কাছে থাকতে,

বকুল ডালে লুকিয়ে থেকে

পাখির মত ডাকতে”।

যে নদীর এত সৌন্দর্য তাঁর কাছে থাকতে তো মন আকুলি বিকুলি করবেই।আমি কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত দেখিনি কিন্তু তিতাসকে দেখেছি।

শেয়ার করুণঃ

shares